বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস

২০২৬ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হবে ২.৬%

বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য উত্তেজনা, উচ্চ শুল্ক ও বিভিন্ন সরকার বা সংস্থার নীতিগত অনিশ্চয়তার মধ্যেও স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতি।

বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য উত্তেজনা, উচ্চ শুল্ক ও বিভিন্ন সরকার বা সংস্থার নীতিগত অনিশ্চয়তার মধ্যেও স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতি। এমন প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সংশোধন করে কিছুটা বাড়িয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির সর্বশেষ ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টস’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছতে পারে, যা গত জুনের পূর্বাভাসের চেয়ে দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি। এছাড়া ২০২৭ সালের জন্য এ প্রবৃদ্ধির হার ২ দশমিক ৭ শতাংশ হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির এ ঊর্ধ্বমুখী সংশোধনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই এসেছে মার্কিন অর্থনীতির শক্তিশালী অবস্থানের কারণে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির ফলে বিশ্ব বাণিজ্যে অস্থিরতা তৈরি হলেও বড় ধরনের কর সুবিধা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে সচল রেখেছে। ২০২৬ সালে দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ২ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। এছাড়া বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরে আসা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বড় বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির ধারাকে ত্বরান্বিত করেছে।

তবে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সংশোধন করে বাড়ানো হলেও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এখনো বড় ধরনের ঝুঁকি রয়ে গেছে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে যে বর্তমান প্রবৃদ্ধির গতি গত নব্বইয়ের দশকের তুলনায় অনেক কম। যদি এ ধারা অব্যাহত থাকে, তবে চলতি দশক হবে ১৯৬০ সালের পর থেকে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে দুর্বল ও মন্থর প্রবৃদ্ধির দশক। এতে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান তৈরির প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইন্দরমিত গিল বলেন, ‘প্রতি বছর বিশ্ব অর্থনীতি নীতিগত অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে স্থিতিস্থাপকতা দেখালেও এর প্রবৃদ্ধি তৈরির ক্ষমতা ক্রমাগত কমছে। অর্থনৈতিক গতিশীলতা এবং এ স্থিতিস্থাপকতা দীর্ঘ সময় বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না। আর তা অব্যাহত থাকলে সরকারি অর্থায়ন ও ঋণ বিশ্ববাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।’

প্রতিবেদনে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান আয়বৈষম্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে প্রায় সব উন্নত দেশ তাদের ২০১৯ সালের (করোনা-পূর্ব) মাথাপিছু আয়ের স্তর ছাড়িয়ে গেলেও প্রতি চারটি উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে একটির আয় এখনো সেই স্তরের নিচে রয়েছে। বিশেষ করে দরিদ্র দেশগুলোয় চরম দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য বর্তমান প্রবৃদ্ধি একেবারেই অপর্যাপ্ত। আগামী দশকে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় প্রায় ১২০ কোটি তরুণ কর্মক্ষম বয়সে পা দেবেন, যাদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এখন বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম চ্যালেঞ্জ।

প্রতিবেদনের দেশভিত্তিক বিশ্লেষণ তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক শুল্ক বাধা ও রাজনৈতিক উত্তেজনা সত্ত্বেও চীনের প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়ে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। অন্যদিকে ইউরোপের দেশগুলোয় (ইউরোজোন) প্রতিরক্ষা খাতে খরচ বাড়ার কারণে ২০২৭ সাল নাগাদ সেখানকার অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তুরস্কের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্যও প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তবে জাপানের মতো কিছু দেশের ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি কার্যকর হওয়ার আশঙ্কায় জাপানি কোম্পানিগুলো আগেভাগেই প্রচুর পণ্য রফতানি করে রাখছে। এতে বর্তমানে প্রবৃদ্ধি বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে দেশটির বিনিয়োগ কমে যাওয়ার এবং প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সাল নাগাদ বিশ্বজুড়ে গড় মূল্যস্ফীতি কমে নেমে আসতে পারে ২ দশমিক ৬ শতাংশে। এটি সাধারণ মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর হলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে ঋণের বোঝা। বর্তমানে এসব দেশের ঋণের পরিমাণ ৫০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এ বিশাল ঋণের চাপ ও অর্থনীতির স্থবিরতা কাটাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি।

সংস্থাটি মনে করছে, বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ কার্যক্রমে বিদ্যমান আইনি বা প্রশাসনিক বাধাগুলো দূর করা এখন জরুরি। এছাড়া সরকারি খরচ ও ঋণের সীমা নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট আর্থিক নিয়ম (ফিসকাল রুলস) কঠোরভাবে মেনে চলার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বাজেট শৃঙ্খলা বজায় রাখলেই দেশগুলো ভবিষ্যতের যেকোনো অর্থনৈতিক ধাক্কা সহজে সামলে নিতে পারবে।

আরও